মহান বিজয় দিবস: ইতিহাসের সত্য, আত্মত্যাগের মহিমা ও রাষ্ট্রের দায়
১৬ ডিসেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়। এটি আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ এবং একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত শপথের দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করে তার চূড়ান্ত বিজয়। এই স্বাধীনতা কোনো আপসের ফল নয়, কোনো গোষ্ঠীর অনুগ্রহ নয়। এটি লক্ষ শহীদের রক্ত, অগণিত আহত মানুষের যন্ত্রণা এবং সাধারণ মানুষের অদম্য সাহসের ফসল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ করে শুরু হয়নি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক দমন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধারাবাহিক প্রতিবাদ থেকেই স্বাধীনতার সংগ্রাম গড়ে ওঠে। এই সংগ্রামের মোড় ঘুরে যায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে। সেই ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয় এবং স্বাধীনতার পথে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভাষণের মধ্য দিয়েই কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা বাস্তব রূপ পায়।
২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। যা ওয়ারলেস এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে । প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র, আর সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণাও ছড়িয়ে পড়েছিল একাধিক কণ্ঠে।
চট্টগ্রামে প্রথম দিককার ঘোষণাগুলোর একটি পাঠ করেন এম এ হান্নান। তিনি স্থানীয়ভাবে বেতার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন। পরবর্তীতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা তুলনামূলকভাবে বেশি সংগঠিতভাবে দেশজুড়ে প্রচারিত হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা স্থানীয়ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ ও প্রচার করেন। এই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে স্বাধীনতার ঘোষণা কোনো একক ব্যক্তির একচ্ছত্র ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রকাশ। তবে সবাই মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর নামেই স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন ।
রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তাজউদ্দীন আহমদ। তাঁর নেতৃত্বেই যুদ্ধকালীন প্রশাসন পরিচালিত হয়, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও অন্যান্য নেতারা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় সেক্টরভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে এম এ জি ওসমানী যুদ্ধকে সংগঠিত করেন। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখসমরে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদের সাহস ও আত্মত্যাগ ছাড়া বিজয় সম্ভব হতো না।
এই যুদ্ধের মানবিক মূল্য ছিল বিপুল ও মর্মান্তিক। ইতিহাস অনুযায়ী প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হন। দুই লক্ষাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হন। এক কোটির বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। এগুলো একটি জাতির গভীর ক্ষত এবং স্মৃতির ভার।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেয়েছিল। ভারত মানবিক আশ্রয়, সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সহায়তা এবং সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়। ভুটান দ্রুত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে কূটনৈতিক সাহসিকতার পরিচয় দেয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিক ভূমিকা ও ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে যুদ্ধকালীন ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সময়ে পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর দমনপীড়ন ও গণহত্যা ইতিহাসে একটি নির্মম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
আজকের প্রেক্ষাপটে বিজয় দিবসের তাৎপর্য আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও মতভিন্নতার মধ্যেও একটি বিষয় উদ্বেগজনকভাবে স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খণ্ডিত ও বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করলে সত্য বদলায় না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত লড়াইয়ের ফল।
বিজয় মানে শুধু পতাকা উত্তোলন বা আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয়। বিজয় মানে ইতিহাস জানা, সত্যকে সম্মান করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই সত্য দায়িত্বের সঙ্গে তুলে ধরা। একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার সত্যভিত্তিক ইতিহাসচর্চায়, ভুলে যাওয়ায় নয়।
সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
মহান বিজয় দিবসের চেতনায় দায়িত্বশীল, সত্যনিষ্ঠ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ।

