এক আজব শিক্ষা গুরুর দুর্বোধ্য আচরণের প্রভাব - মোহাম্মদ আইয়ুব
(একটি স্মৃতিচারণমূলক অকৃত্রিম উপাখ্যান)
প্রথম অংশঃ
অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় অঙ্কে ৩৪ নম্বর পেয়ে টেনেটুনে পাস করেছিলাম। অন্যান্য বিষয়ে ভাল মার্ক পাওয়ায় শতাধিক ছাত্রছাত্রীর মধ্যে কম্বাইন্ড রেজাল্টে পাঁচ নাম্বারে ছিলাম। ক্লাস টিচার জাহেদ স্যার বললেন- অঙ্কে ভালো করলে ৩ এর মধ্যে থাকতে পারবে। নবম শ্রেণির শুরু থেকে অঙ্কে ভালো করার চেষ্টা করো।
একটি তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে একটি বানর প্রথম মিনিটে তিন মিটার ওঠে, দ্বিতীয় মিনিটে এক মিটার নামে। ১৩ মিটার লম্বা বাঁশের মাথায় উঠতে বানরের কত মিনিট সময় লাগে। অথবা
একটি চৌবাচ্চার তিনটি নল আছে ১ম ও ২য় নল দ্বারা যথাক্রমে ৩০ ও ২০ মিনিটে পূর্ণ হয় এবং ৩য় নল দ্বারা ৬০ মিনিটে খালি হয়। নল তিনটি একসাথে খুলে দিয়ে ১ম নল কখন বন্ধ করলে চৌবাচ্চাটি ১৮ মিনিটে পূর্ণ হবে।
এই গুলি কোন ভাবেই আমার মাথায় ঢুকত না। বড়ই দিকদারি লাগতো। বরং মনে হতো বাঁশে তেল মেখে বানরকে উঠতে দেওয়ার কোন দরকার আছে? কিংবা চৌবাচ্চার তিনটি নল একসাথে খুলে দেওয়ার হেতু কী?
সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক এই আজাইরা জামেলা রপ্ত করে প্রয়োজনে তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে হাতি ওঠাব। বানরের জায়গায় হাতি-ঘোড়া লিখলেও উত্তর একই হবে।
প্রতিবেশী আদর্শবান জমিদার পিতার কনিষ্ঠ পুত্র পড়ালেখা শেষ করে টাইপালং দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বাড়ির পাশে একটি চৌচালা বেড়ার ঘর তৈরি করে কোচিং শুরু করেন। স্কুল-কলেজের বহু ছাত্রছাত্রী সেখানে পড়তে যায়। আমিও ঠিক করলাম জানুয়ারি মাস থেকে তাঁর কাছে অঙ্ক শিখব।
গুরুমশাই সম্পর্কে আমার মামা হয়। মোস্ট সিনিয়র হওয়ায় কখনো সামনে যেতাম না।
আমি কোচিং সেন্টারে গিয়ে দেখি কলেজে পড়ুয়া প্রতিবেশী খোরশেদ মাইজ্জা (ভাইদের মধ্যে বয়সে বড় ও দ্বিতীয়) , বড় ভাই করিম সহ আরো কয়েক জনকে অতিশয় আদর - যত্নে পড়াচ্ছেন। তাঁর আকর্ষণীয় পাঠ দান দেখে একদিকে অঙ্ক শিখতে পারব এই আত্মবিশ্বাস বাড়ল। অন্যদিকে দীক্ষা নেওয়ার পূর্বেই হবো গুরুর প্রতি মনের গহিনে ভক্তি ভাব সঞ্চার হলো।
বড় ভাইদের ছবক দেওয়ার পর মুখে এক খিলি পান গুঁজে দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- কে তুমি, কী হেতু আগমন? আমার নাম ও পিতার নাম বললাম।
- গোল চম্পা বুবুর ছেলে?
জি।
- অনেক বড় হয়ে গেছ। সেই পিচ্চি থাকতে বুবুর কোলে দেখছিলাম। কোন ক্লাসে পড়?
নবম শ্রেণিতে। আমি অঙ্কে অতি কাঁচা, আপনার কাছে অঙ্ক পড়তে চাই।
- আগামি সপ্তাহ থেকে নবম শ্রেণির একটি ব্যাচ শুরু হবে। প্রতিদিন সকাল ৭ টায় চলে আসবে। তোমার ক্লাসের আরো ৬/৭ জন ছাত্রছাত্রী আসবে। নিয়মিত আসতে হবে।
ঠিক আছে স্যার, বলেই সালাম দিয়ে বিদায় নিলাম। যাক গণিতশাস্ত্রভীতি কাটানোর আপাতত একটি বন্দোবস্ত হলো।
আমার গুরুমশাইর পূর্বাপর দুইএকটা ঘটনার বর্ণনা করছি। যা পাঠান্তে সহজে বোধগম্য হবে, এইরূপ গুরু কয়জনের ভাগ্যে জুটে।
স্যার, কলেজে পড়াকালীন ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনের তপশিল ঘোষিত হয়। চেয়ারম্যান/মেম্বার প্রার্থীদের পক্ষে গ্রামে মিছিল হতো।
স্যারও গ্রামের সকল শিশুদের জড়ো করে মিছিল করাতেন। আমার ভাই, তোমার ভাই
সেলিম ভাই, সেলিম ভাই।
কিন্তু কেউ কেউ সেলিম মামা, সেলিম বদ্দা, সেলিম হাক্কু বলে ফেলত। এই ভুল বলার অপরাধে শাস্তিস্বরূপ তাদের চকলেট কম দিতেন।
স্কুলে কুচকাওয়াজের অনুশীলন চললে তিনিও গ্রামের প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে একটি দল গঠন করতেন আর নিজে কমান্ড দিতেন, লেপ্ট-রাইট, লেপ্ট- রাইট- । অনুশীলন শেষে সবাইকে সমুচা- শিঙ্গারা খাওয়াতেন।
একদিন স্যারের বাবা এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুরুব্বি সিকদার সাহেব এই দৃশ্য দেখে বললেন- মাঠে সবার একই রঙের ড্রেস ও জুতা দেখি। এখানে দেখছি কেউ জামা গায়ে, কেউ গেঞ্জি, কেউ সেন্ডু গেঞ্জি আবার কেউ লুঙ্গিতে গোছ মারা। কেউ স্যান্ডেল পায়ে আবার কেউ খালি পায়ে। যতসব পাগলামি। তোর এইসব পাগলামি কবে যে দূর হবে।
স্যারের সহজ সরল জবাব- ফাইনাল রিহার্সেলে সবার ড্রেস এক এবং অভিন্ন হবে।
শুক্রবার স্কুল বন্ধ। স্যারের গঠিত কন্টিনজেন্টের ফাইনাল রিহার্সেল বাড়ির উঠানে অনুষ্ঠিত হবে। সবাইকে সকাল ১০ টার মধ্যে হাজির থাকার জন্য বলে দিয়েছেন। সমুচা-শিঙ্গারার পরিবর্তে পরোটা-মাংস খাওয়াবেন।
সবাই যথাসময়ে হাজির। তিন সারিতে পলিন করালেন। প্রথমে দলপতি নির্বাচন। জিয়া একটু লম্বা-চওড়া হেতু তাকে দলপতি নির্বাচন করলেন।
এবার অভিন্ন ড্রেস পরিধানের পালা। স্যার বললেন- ত্রিশ জনের জন্য একই রকম শার্ট-প্যান্ট ও জুতা মৌজা কোন দোকানেই মিলাতে পারিনি। তাই আমি ঠিক করেছি, তোমরা সবাই জন্মদিনের পোশাকে মার্চ করবে। জন্মদিনের পোশাক সম্বন্ধীয় পাঁচ মিনিট ব্রিফিং করলেন।
ব্রিফিং শেষে কমান্ড দেওয়ার সাথে সাথে সবাই ন্যাংটা হয়ে গেল। তিন লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো, অপূর্ব লাগছিল। তবে কয়েক জনের কোমরে কালো গুঞ্চি থাকায় দৃষ্টিকটু দেখাচ্ছিল। তাই স্যার নিজেই তাদের গুঞ্চি খুলে নিলেন।
এবার দলপতির কমান্ডে মার্চপাস্ট শুরু হলো। সাধারণত রণ সংগীত অথবা উচ্চাঙ্গসংগীতের তালে তালে কুচকাওয়াজ হয়। আজকে দেখছি লেপ্ট - রাইটের তালে তালে নিম্নাঙ্গসংগীত পরিবেশিত হচ্ছে।
স্যারের খুলুভাই (ভাইদের মধ্যে বড় ও তৃতীয়), বাদল মামা এইদৃশ্য দেখে, "সেইল্যা তোর আর কোন কাজ নাই। এসব বন্ধকর্। নইলে আমি বদ্দাকে ডেকে আনতেছি"।
বাদল মামার হুঙ্কারে প্রথমেই দলপতির রকেট বেগে বোঁ - দৌড়। বাড়িতে যাওয়ার পর মনে পড়ল, তার কোমরের গুঞ্চিসহ পরনের কাপড় ফেলে এসেছে।
একদিন বাদল মামা পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে স্যারকে সহকারী তহশিলদার পদের জন্য আবেদন করতে বললেন। স্যারও যাথানিয়মে আবেদন করলেন।
পরীক্ষার দিন বাদল মামা হলের গেইটে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু প্রার্থী আসার কোন লক্ষণ নাই। পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা পর পান চিবুতে চিবুতে গেইটে আসলেন। বাদল মামা রাগে গরগর করছেন। তবু কিছু বলে সময় নষ্ট না করে গেইটম্যানকে বলেকয়ে ঢুকিয়ে দিলেন।
গেইটে দাঁড়িয়ে বাদল মামা চিন্তা করছেন অংশ নিতে দেয় কি না? প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। সবাই নির্ধারিত সময়ের ১০/১৫ মিনিট আগে ঢুকে গেছে। আর তে শুরু হওয়ার ৩০ মিনিট পর আসলো। তারে দিয়ে যে কী হবে আল্লাহ ভাল জানেন!
পরীক্ষার সময় আধা ঘণ্টা বাকি থাকতে হল থকে বেরিয়ে আসলেন। বাদল মামা জিজ্ঞেস করলেন পরীক্ষা দিতে দেয় নাই?
- কেন, দিছি তো। ফুল অ্যানসার করছি।
অন্যকেউ এখনো বের হলো না। তুই চলে আসলি। কই প্রশ্নপত্র দেখা।
- প্রশ্নপত্র রেখে দিছে। সহজ প্রশ্ন। লেখা শেষ। বসে থেকে বিরক্ত লাগছিল আর পান খেতে হবে। তাই খাতা দিয়ে চলে এলাম।
স্যারের এটিই ছিল প্রথম এবং শেষ সরকারি চাকরির ইন্টার্ভিউ। তিনি এই চাকরিতে এখনো আছেন।
আমার সেই আজব গুরুমশাইর পুরো নাম আকতারুল ইসলাম সেলিম। উখিয়া উপজেলা সদরের ঘিলাতলী গ্রামের গুণী পিতা মীর আহাম্মদ সিকদার এর চার মেধাবী সন্তানের চতুর্থ জন।
১৯৯৩ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে স্যারের নিকট নবম শ্রেণির অঙ্কশাস্ত্রের উপর তালিম নেওয়া শুরু করি। --[চলবে]
লেখক-
মোহাম্মদ আইয়ুব,
পুলিশ পরিদর্শক,
সদর দক্ষিণ সার্কেল অফিস, কুমিল্লা।
তারিখ-৮/৫/২০২৩খ্রি.

